মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে পড়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো। ইরানের একের পর এক ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এখন রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে পেন্টাগন। এই লড়াই কেবল সামরিক শক্তির নয়, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ভয়াবহ আর্থিক ও কৌশলগত সংকট।

গত মাসে জর্ডানে অবস্থিত তিনটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরান বড় ধরনের হামলা চালায়। ড্রোনের বৃষ্টির মাঝে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বর্ম ভেদ করে ঘাঁটিতে আঘাত হানে। এতে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন শতাধিক। এই ঘটনা মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘদিনের অপরাজেয় ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

আর্থিক হিসাবটা শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। ওই ঘটনার মাত্র এক দিনে মার্কিন বাহিনী প্রায় পঞ্চাশটি প্যাট্রিয়ট (Patriot) ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিটি মিসাইলের পেছনে খরচ হয় প্রায় চার মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় পেন্টাগনের খরচ হয়েছে দুইশ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ।

চলমান এই সংঘাতের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করা হয়েছে। হিসাব করলে দেখা যায়, গত কয়েক মাসে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র কেবল আকাশপথেই ধ্বংস হয়ে গেছে। এটি আমেরিকার জন্য কেবল আর্থিক বোঝা নয়, বরং এক ভয়াবহ নিরাপত্তার হুমকি।

আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় সংকট দেখা দিয়েছে মজুদের পরিমাণে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মজুদে সতেরোশোর কম ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট রয়েছে। মিসাইল তৈরির উৎপাদন গতি প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত ধীর। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ছয়শ প্যাট্রিয়ট মিসাইল তৈরি করতে পেরেছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় খুবই নগণ্য একটি সংখ্যা।

বর্তমান সংঘাতের গতিতে যদি মিসাইল ব্যবহৃত হতে থাকে, তবে এই ভাণ্ডার পূরণ করতে অন্তত তিন বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি এখন শূন্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পেন্টাগনের নীতিনির্ধারকরা এখন বুঝে উঠতে পারছেন না কীভাবে তারা এই চাহিদার সাথে উৎপাদন তাল মিলিয়ে চলবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের অন্যতম কারণ হোয়াইট হাউসের প্রাথমিক ভুল অনুমান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (Trump) এবং তার টিম ধারণা করেছিলেন, ইরানের সাথে এই সংঘাত হবে স্বল্পমেয়াদী। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পেন্টাগনের এই ভুল কৌশল আজ তাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সরকারি পর্যায়ে অবশ্য বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গত এপ্রিলে প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ (Pete Hegseth) দাবি করেছিলেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এমনকি পেন্টাগনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের মিসাইল সংকটের কথা অস্বীকার করা হয়েছে। তবে ভেতরের খবর বলছে, পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ।

ইরান বর্তমানে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের কৌশলগুলো খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা আকাশপথে বিপুল পরিমাণ ড্রোন পাঠিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত করে রাখে। এই কৌশলকে বলা হয় 'স্যাচুরেট' (Saturate) করা। এতে মার্কিন প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের মূল লক্ষ্যভেদ করার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মিসাইল অপচয় হয়।

অন্যদিকে ইরান তাদের পারমাণবিক ও সামরিক সম্পদ মাটির গভীরে বাংকারে সরিয়ে নিয়েছে। তারা আঞ্চলিক মিত্রদের ব্যবহার করে বিভিন্ন দিক থেকে হামলা চালাচ্ছে। এতে মার্কিন বাহিনীর পক্ষে প্রতিটি ঘাঁটি রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ইরানের এই কৌশলের কাছেই আজ পরাশক্তির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যুদস্ত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে আজকের এই পরিস্থিতি কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি আর্থিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ছয় বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় এবং মজুদের দ্রুত ফুরিয়ে আসা—এই দুই সংকট পেন্টাগনের নীতিনির্ধারকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ চললে মার্কিন ঘাঁটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করলেও, পর্দার আড়ালে পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রতিটি মিসাইল এখন সোনার চেয়েও দামি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে হোয়াইট হাউসের ভেতরেই এখন তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে আমেরিকা কীভাবে এই ভারসাম্য বজায় রাখবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

সংঘাতের এই কঠিন সময়ে প্রতিটি ডলার এবং প্রতিটি মিসাইল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেন্টাগনের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত মজুদের যোগান দেওয়া এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করা। তবে এই ব্যয়ভার বহন করা মার্কিন অর্থনীতির জন্য কতটা সহনীয় হবে, তা সময় হলেই বোঝা যাবে।

Walton Ads